নাগরানী

 নাগরানী।












মধ্যরাতে আমার বোনের রুম থেকে উদ্ভুত শব্দ শুনে তার রুমে প্রবেশ করতেই দেখি আমার বোনকে   চার চারটা  কালো সাপ চার দিক থেকে জড়িয়ে ধরে আছে। প্রায় রাতেই আমার বোনের রুম থেকে কী সব ভয়ংকর শব্দ  ভেসে আসে।  এ কথা আমাদের বাড়ির কাজের মেয়েটি আমাকে বলে ছিলো। কিন্তু তখন আমি এই কথাটাকে অতোটা গুরুত্ব দেয়নি।


কিন্তু আজ আমি নিজের কানে এই উদ্ভুত শব্দ শুনতে পেয়েছি। আর এই শব্দ শুনেই আমি আমার বোনের রুমের দিকে যাই। আর রুমে গিয়েই যা দেখলাম তা তো আপনারা শুনলেন ই। আমি রুমে প্রবেশ করে সাপ গুলোকে দেখা মাত্র  দুহাত দিয়ে চোখ বন্ধ করে একটা চিৎকার দিয়ে উঠলাম। আমার চিৎকার এর আওয়াজ শুনে আমাদের বাড়িতে কাজ করা মেয়েটি দৌড়ে আমার বোনের রুমে চলে এলো। আর এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো দাদা বাবু আপনি এতো রাতে দিদিমনির রুমে কী করছেন? 


আমি আস্তে আস্তে চোখ খুললাম আর তাকিয়ে দেখলাম রুমে কিছুই নেই। তার পর কাঁপতে কাঁপতে মেয়েটিকে বললাম আমি এই রুম থেকে কিছু উদ্ভুত শব্দ শুনতে পেয়েছি। যার জন্যেই আমি এতো রাতে এই রুমে এসেছি। মেয়েটি আমাকে বললো তাহলে চিৎকার দিলেন কেনো দাদা বাবু? আমি মেয়েটাকে সত্যি কথা বললাম না। সত্যি কথা বললে যদি মেয়েটি ভয় পায়। আর যদি কাজ ছেড়ে দেয়। এই সময় একজন কাজের লোক খুজে বের করা খুবই কঠিন।  আমি মেয়েটিকে বললাম এমনি চিৎকার দিয়েছি। 


কিন্তু একটা বিষয় ভেবে খুবই অবাক হলাম এতো জোরে চিৎকার দিলাম যেটা শুনে কাজের মেয়েটি তার রুম থেকে শুনতে পেয়ে এখানে চলে এলো কিন্তু আমার বোনের ঘুম ভাঙ্গলো না। আমি এবার খাটের উপর শুয়ে থাকা আমার বোনকে ডাকতে থাকলাম।  নুপুর এই নুপুর। ও আপনাদের সাথে তো পরিচয় ই হয়নি। চলুন আপনাদের সাথে পরিচয় হয়ে নি আগে। আমি শাহিনুর আলম পিয়াস।  আর যে মেয়েটাকে ৪টা সাপ জড়িয়ে ধরে ছিলো ও হলো আমার বোন নুপুর। 


আমি ভালো একটা কম্পানিতে জব করি। আর আমার বোন ভার্সিটিতে পড়া শুনা করে। আমাদের বাবা মা নেই। বাবা  মা নাকি একটা দূর্ঘনায় মারা গেছে আমার দাদুর মুখ থেকে শুনেছি। বাবা মা মারা যাওয়ার পর দাদু আমাদের দুজন কে মানুষ করেছে। যাক মূল ঘটনায় আসি আমি নুপুর কে বার বার ডাকছি।  কিন্তু সে আমার ডাক শুনছে না। আমি কাজের মেয়েটিকে বললাম একটু পানি নিয়ে আসোতো। মেয়েটি পানি নিয়ে আসলে আমি নুপুরে মুখে হালকা পানির ঝাঁপটা দিলাম। এবার নুপুর আস্তে আস্তে তার চোখ খুললো। 


আর আমাকে জিজ্ঞেস করলো ভাইয়া আমার কী হয়েছে। আর তুমি এতো রাতে আমার রুমে কী করছো?  আমি বললাম এমনি তোর রুম থেকে  উদ্ভুত শব্দ শুনে আমি তোর রুমে এসে দেখি তুই অজ্ঞান  হয়ে বিছানায় পরে আছিস। আমি নুপুর জিজ্ঞেস করলাম তোর সাথে কী হয়েছিলো তোর কী মনে আছে? নুপুর বললো ওর সাথে কী হয়েছে ও তা জানে না। ও নাকি ওর মতো ঘুমিয়ে ছিলো। আর হঠাৎ কিছু একটা ওকে ঘিরে ধরলো আর আস্তে আস্তে ও ওর জ্ঞান হারিয়েছে। আমি বুঝতে পারলাম ওই সাপ গুলোই ওকে পেঁচিয়ে ধরে ছিলো। আমি সত্যি কথাটা 

নুপুর কে বললাম না।


বললাম তুই ঘুমের ঘরে নিশ্চয়ই কোন ভয়ানক সপ্ন দেখেছিস যার ফলে তুই তোর জ্ঞান হারিয়েছিস। আমি  বললাম তুই শুয়ে পর বোন।  আমি নুপুর কে ওর রুমে শুয়িয়ে ড্রেসিং রুমে চলে এলাম। সুফায় বসে বসে ভাবতে লাগলাম কী হচ্ছে এগুলো আমার বোনের সাথে। আমি ওর রুমে গিয়ে এসব কী দেখলাম?  আমি কী ভুল দেখলাম? সেদিন সারা রাতে আমার আর ঘুম হলো না। আমি সারা রাত ড্রেসিং  রুমেই কাটিয়ে দিলাম।  যাক সেদিন রাতটা কোন মতে কাটলো। সকাল বেলা আমি খাবার টেবেলি বসে ছিলাম। কাজের মেয়েটিকে বললাম যাও নুপুর কে ডেকে আনো। 


কাজের মেয়েটি নুপুর কে ডাকতে গেলো। কাজের মেয়েটি নুপুরের রুম থেকে দৌড়ে এলো আর হাঁপাতে থাকলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে এ ভাবে হাপাচ্ছো কেনো? আর নুপুর কোথায়? কাজের মেয়েটি আমাকে জানালো দাদা বাবু দিদিমনির শরীরে প্রচন্ড জ্বর এসেছে। জ্বরে দিদিমনি কাঁপতেছে। আমি আর কিছু না ভেবেই দৌড়ে নুপুরে রুমে চলে এলাম।  আর এসেই নুপুরে কপালে হাত দিয়ে দেখি সত্যি  খুব জ্বর।  আমি তারা তারি নুপুর কে হাসপাতালে নিয়ে চলে এলাম। হাসপাতালে আনার পর নুপুর আমাকে বললো ভাইয়া আমার সারা শরীরে কাল থেকে খুব প্রচন্ড ব্যাথা হচ্ছে।  এই ব্যাথার যন্ত্রনা আমি সহ্য করতে পারছি না। 


প্লিজ ভাইয়া দয়া করে তুমি কিছু একটা করো। আমি ততক্ষণাৎ ডাক্তার এর চেম্বারে চলে গেলাম।  গিয়েই ডাক্তার কে জিজ্ঞেস করলাম ডাক্তার সাহেব আমার বোনের কী হয়েছে?  ওর সারা শরীরে নাকি প্রচন্ড ব্যাথ্যা হচ্ছে।  ডাক্তার আমাকে জানালো  আপনার বোনের প্রচন্ড জ্বর  হয়েছে। যার জন্য শরীরে একটু ব্যাথা হচ্ছে।  আমরা ট্রিটমেন্ট করে দিয়েছি। একটু পর কমে যাবে। আমি পুনরায় রাহির কাছে আসলাম।  আমি ওর মাথায় বার বার হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলাম। নুপুর শুধু বলছে ভাইয়া আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমার পুরো শরীর ব্যাথায় জ্বলে যাচ্ছে। আমার মা মরা বোনের কান্না আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।


 আমি ওই খান থেকে উঠে এলাম। আর দুই রাকাআত নফল নামাজ আদায় করলাম। আর আল্লাহ কাছে আমার বোনের জন্য দোয়া করলাম। আমি বাইরে বসে ছিলাম।  আর ভিতরে আমার বোন ব্যাথায় চিৎকার করছিলো। প্রায় রাত তিনটার মতো হবে তখন নুপুরের রুম থেকে আর কোন চিৎকার এর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম না।  আমি ভাবলাম হয়তো ব্যাথাটা একটু কমেছে। আমি নুপুরে  বেডে ঢুকলাম  আর ঢুকেই খুব ভয় পেলাম।  আমি দেখলাম নুপুরে চারদিকে চারটা সাপ দাঁড়িয়ে আছে। আর ওই সাপ গুলোর মাথার উপর থেকে এক বিকট আলো বের হয়ে নুপুরের সারা শরীরে পরছে। আর খেয়াল করলাম এই আলোয় নুপুর খুব আরাম পাচ্ছে।

এই দৃশ্য দেখার পর আমি একদম নিশ্চুপ হয়ে গেলাম।  আমি ভয়ে চিৎকার দিতে চেয়েও চিৎকার দিলাম না। আমি ভাবলাম যেটা হচ্ছে হউক না কেনো? আমার বোনটা তো ব্যাথা থেকে মুক্তি পাচ্ছে।  তাই আমি কিছু না ভেবেই ওখান থেকে বাইরে চলে আসলাম।  বাইরে প্রায় এক ঘন্টা কাটালাম। তার পর আমি পুনরায়  আমার বোন নুপুরের রুমে ঢুকলাম।  আর ঢুকেই দেখলাম আশে পাশে কোন সাপ নেই। চার দিক একে বারে নিরব হয়ে আছে।

!

!

আমি নুপুরের দিকে তাকিয়ে দেখি  একদম গভির ঘুমে আচ্ছন্ন।  আমি নুপুরের মাথায় হাত দিয়ে দেখলাম ওর একটু ও জ্বর নেই শরীরে। কিন্তু কী আজব ব্যাপার একটু আগে ও  শরীরে প্রচন্ড জ্বর ছিলো। বিষয় টা আমাকে খুবই ভাবাচ্ছে। কী হচ্ছে এসব আমার বোনের সাথে? আমি হাসপাতালের বারান্দায় পায়চারি করতে থাকলাম। ফজরের নামাজের আজান হলে আমি নামাজ আদায় করে নিলাম। সকাল বেলা ডাক্তার এলো  পরিক্ষা করতে।

!

!

ডাক্তার এসে বললো আপনার বোন এখন সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। আপনি ইচ্ছে করলে তাকে এখনি বাড়ি নিয়ে যেতে পারেন। আমি বাইরে থেকে খুশি হলেও ভেতর ভেতরে খুবই ভয়ে ভয়ে আছি।  আমি নুপুর কে নিয়ে বাড়ি চলে এলাম।  বাড়ি এসেই কাজের মেয়েটিকে বললাম নুপুরের জন্য এক গ্লাস গরম দুধ আনতে। মেয়েটি এক গ্লাস দুধ নিয়ে এলো। নুপুর সেটা খেতে থাকলো। আর কাজের মেয়েটি নুপুর কে বললো দিদিমনি আপনি এখন সুস্থ হয়ে উঠবেন।

!

!

আমরা চারজন তো আছি। এই কথা শুনে আমি খুবই অবাক হলাম।  আমি কাজের মেয়েটিকে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম তোমরা চারজন আছো মানে?🙄 মেয়েটি আমতো আমতো করা শুরু করলো। আর দ্রুতো পায়ে ওখান থেকে রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো। আমি নুপুর ওর রুমে দিয়ে এলাম।  দিয়ে ড্রইং রুমে এসে বসে আছি। আমি খেয়াল করলাম সদর দরজা দিয়ে আমাদের ওই কাজের মেয়ে বাজার ভর্তি ব্যাগ নিয়ে বাড়িতে ঢুকছে।

!

!

!

এই দৃশ্য দেখে আমার চোখ তো কপালে উঠে গেলো।  আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম তুমি?  মেয়েটি আমাকে সাধারণ ভাবে বললো আমি বাজারে গিয়েছিলাম দাদা বাবু। ঘরে রান্না করার মতো কিছুই নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম একটু আগে তুমি নুপুর কে দুধ খেতে দাওনি?   মেয়েটি বললো কখন? আমি তো বাজার থেকে আসলাম মাত্র।  দিদিমনি এসেছে নাকি? আমি বললাম হ্যা তার রুমে আছে। মেয়েটি নুপুরের রুমে চলে গেলো।

!

!

 আর আমি ভাবতে থাকলাম একটু আগে যে নুপুর কে দুধ খেতে দিলো এবং রান্না ঘরের দিকে গেলো ওই মেয়েটা তাহলে কে?  আমি দৌড়ে রান্না ঘরের দিকে আসতে থাকলাম।  আমি রান্না ঘরে ঢুকলাম। ঢুকে কাউকেই দেখতে পেলাম না।  কিন্তু ভালো ভাবে খেয়াল করে দেখলাম কারো পায়ের ছাপ রান্না ঘরে।  সেই পায়ের ছাপটা রান্না ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে। আমার আর বুঝার বাকি রইলো না এটা যে মানুষ নয়।

!

!

!

যাক দুই একদিন ভালই কাটলো। নুপুরের ঘর থেকে আমি ও আর ওই উদ্ভুত শব্দটা কিছুদিন ধরে শুনতে পাচ্ছিলাম না।  তাই আমি একটু শান্তি পাচ্ছিলাম। কিন্ত আমি ইদানিং খেয়াল করছি নুপুর কেমন জানি হয়ে যাচ্ছে? ওর আচার আচরণ কেমন জানি বদলে গেছে। ও যে কোন কথায় রেগে যায়। কথায় কথায় বাসার কাজের মেয়েটির গায়ে হাত তুলে। 

!

!

!

সেদিন রাতের বেলা আমি নুপুরের রুমে যাই। আর নুপুর আমাকে দেখেই ওর হাতে থাকা কিছু একটা ও তারা তারি লুকিয়ে ফেললো। আমি নুপুর কে বললাম তুই আমাকে দেখে কী লুকালি দেখি? নুপুর বললো কই কিছু নাতো ভাইয়া। আমি আবার ও বললাম কি লুকিয়ে রাখলি দেখা আমাকে? আমার কাছে মিথ্যা কথা বলিস না। নুপুর বললো বললাম তো কিছু না। আমি নুপুরের মাথায় হাত রেখে বললাম বোন কী হয়েছে তোর?

!

!

!

দিন দিন এমন হয় যাচ্ছিস কেনো? কাজের মেয়েটির গায়ে সারা দিন হাত তুলিস যে? নুপুর কিছু বলছে না শুধু চুপটি করে আছে। আমি আবার বললাম বল বোন চুপ করে থাকিস না। এবার নুপুর আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললো।  আর বললো ভাইয়া রে আমি জানি না আমার কী হয়েছে। আমার কিছুই ভালো লাগে না। সব কিছু কেমন জানি লাগে। আর শরীর শুধু ছট ফট করে। বোনটাকে অনেক ভালোবাসি। ওকে শক্ত করে বুকে টেনে নিয়ে কেঁদে কেঁদে বললাম কী হলো আমার বোনটার?

!

!

!

আমার পুরো বাড়িটা অশান্তিতে ভরে উঠলো।  কারন আমার বোনটাই আমার সব। ওর কিছু হলে আমার কিছুই ভালো লাগে না। আর আমার সেই বোনটাই অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে আছে। তার তিন দিন পরের কথা।  সকাল বেলা আমি খাবার টেবিলে বসে নাস্তা করছিলাম। আর মনে মনে ভাবছিলাম গ্রাম থেকে একবার দাদুর সাথে দেখা করে  আসি। আর তাকে সব খুলে বলি দেখি তিনি কী বলে?

!

!

!

আমি কাজের মেয়েটকে বললাম যাও নুপুরের ঘরে খাবার গুলো দিয়ে আসো। মেয়েটি প্রথমে যেতে চাইলো না। আমি জোর করে বললাম যাও কিছু হবে না। মেয়েটি অনিচ্ছার সর্তেও নুপুরের ঘরে খাবার নিয়ে গেলো। আর একটু পর মেয়েটি দৌড়ে নুপুরের রুম থেকে চলে আসলো। আর আমাকে হাঁপাতে হাঁপাতে বললো দাদা বাবু দাদা বাবু নুপুর দিদিমনি কে দেখতে সাপের মতো লাগছে।

Post a Comment

Previous Post Next Post